বাংলাদেশে গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয়েছে গতকাল শুক্রবার। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের শেষে প্রতিবেশী দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে হওয়া ৪০ মিনিটের এই বৈঠককে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। বিশ্লেষকরাও মুহাম্মদ ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে বৈঠকে বাংলাদেশের উত্থাপিত সব বিষয় ভারত আমলে নাও নিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাতের জন্য চেষ্টা হয়েছিল; কিন্তু ভারত খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। পরে ডিসেম্বরে প্রধান উপদেষ্টা দিল্লিতে গিয়ে হলেও মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন, তবে ভারত নাকচ করে দেয়। এরপর বাংলাদেশ আবার বিমসটেকে সময় চায়। তবে ভারত কিছু না জানিয়ে শেষ সময়ে বৈঠক করে, যা অনেকটা প্রমাণ করে—তারা (ভারত) অনিচ্ছা সত্ত্বে আলোচনা করেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেহেতু বারবার সময় চাওয়া হচ্ছিল, ফলে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে বিশ্বকে জানাতে যে, তারা আলোচনার টেবিলে বসেছে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় ইস্যুগুলো তোলা গেছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু বৈঠক ইতিবাচক হলেও ফলপ্রসূ হয়নি বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে বিষয়গুলো তোলা হয়েছে তা আমাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট। এগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। তবে আমার মনে হয় আমাদের উত্থাপিত বিষয়গুলো আমলে নেবে না ভারত। গঙ্গা চুক্তি ২০২৬-এ নবায়নের কথা থাকলেও মনে হয় না সেটি হবে। এ ছাড়া শেখ হাসিনাকেও ভারত ফেরত দেবে না। সুতরাং দুপক্ষ তাদের কথা জানিয়েছে, কিন্তু তার ফলাফল অধরাই থাকবে।’
বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে যেসব বিষয় উত্থাপিত হয়েছে তা এখন কিছুটা উত্তেজনা তৈরি করবে বলে মনে করেন এম সফিউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যম বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করবে। তারা (ভারত) সংখ্যালঘু নিয়ে গত আগস্ট থেকেই বলে আসছে, সেটি আবারও তারা সামনে এনেছে। যদিও আমাদের প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ছাড়া সীমান্ত বিষয়ে তারা গুরুত্ব দেবে আশা করি। তবে দুদেশ যেহেতু প্রতিবেশী, ফলে আমাদের সম্পর্ক জনকেন্দ্রিকভাবে এগিয়ে নিতে হবে।’
দুই সরকারপ্রধানের বৈঠক প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব এ কে এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের জন্য অনেকদিন ধরে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে, তবে দুই নেতার বৈঠক হবে কি না তা নিয়ে দোটানা ছিল গতকাল পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত বৈঠক হয়েছে। তবে যেহেতু সাইড লাইন বৈঠকগুলো খুব লম্বা সময় ধরে হয় না, অল্প সময়ের জন্য হয়, ফলে কুশলাদি বিনিময় ছাড়া খুব একটা আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু বিষয় তোলা হয়েছিল। এখন আমাদের বক্তব্য শুনে ভারত কী করবে, সেটা ভারতের একান্ত বিষয়। তারা কোনটি রাখতে পারবে আর কোনটি রাখতে পারবে না এখন বলা মুশকিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব নিয়ে কথা বলেছি তার হয়তো সব ভারত আমলে নেবে না। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নাও হতে পারে। তবে আমার মনে হয় সীমান্ত সমস্যা কিছুটা পরিবর্তন হতেও পারে। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে—ভারত কী পদক্ষপে নেয়।’
বাংলাদেশের হিন্দুসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে বৈঠকে ভারতের উদ্বেগ জানানো প্রসঙ্গে আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সংখ্যালঘু ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টা প্রথমেই জানিয়েছে যে, দু-একটি জায়গায় এ ঘটনা ঘটলেও এটি যেভাবে প্রচার হচ্ছে তা বানোয়াট। সরকারের এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।’