কাজ করার ইচ্ছা ছিল, ছিল বাড়তি আয় করে সংসারে অবদান রাখার স্বপ্ন; কিন্তু সুযোগের অভাবে ঘরেই বসে থাকতে হতো লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত এলাকার অনেক নারীকে। কারো জানা ছিল সেলাই, কেউ পারতেন কাপড় কাটতে, আবার কেউ ছিলেন নতুন কিছু শেখার অপেক্ষায়। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে স্বামী-স্ত্রীর ছোট্ট এক উদ্যোগ। নিজেদের বসতবাড়িতে গড়ে তোলা ক্ষুদ্র পোশাক কারখানায় এখন কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় শতাধিক নারীর। কেউ কাপড় কাটছেন, কেউ রং করছেন, আবার কেউ করছেন বুটিকের কাজ—নিজ এলাকায় থেকেই বদলাচ্ছে তাদের জীবন ও সংসারের হিসাব।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের তালুক দুলালী পাগলার চওড়া এলাকায় বসতবাড়িতে কারখানাটি গড়ে তুলেছেন আসাদুল হাবিব ও শিউলি বেগম দম্পতি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সেখানে চলে পোশাক তৈরির নানা কাজ। কেউ কাপড় কাটছেন, কেউ রং করছেন, আবার কেউ কাপড়ে আঁকছেন নকশা। স্থানীয় নারীদের কেউ কারখানায় এসে কাজ করেন, আবার কেউ বাড়িতে বসেই বুটিক ও চুমকির কাজ করে তা কারখানায় জমা দেন। তৈরি পোশাক বিভিন্ন শহরের মার্কেটে সরবরাহ করা হয়।
ক্ষুদ্র কারখানার উদ্যোক্তা আসাদুল হাবিব ও শিউলি বেগম দম্পতি জানান, বিগত ৪-৫ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমান তারা। সেখানেই পোশাক তৈরির কাজ করে আয় করেন কিন্তু এলাকার টানে বেশি দিন ঢাকায় থাকতে পারেননি তারা। নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে এসে হাতে নেন নতুন উদ্যোগ।
নিজেদের আত্মকর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি এলাকার বেকার নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি করতে নেন বড় চ্যালেঞ্জ। অল্প পুঁজিতে শুরু করা উদ্যোগটি এখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলাকার আরও বেকার নারীদের কাজে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
উদ্যোক্তা আসাদুল-শিউলি দম্পতি আরও বলেন, প্রথমে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজ শুরু করেছি। ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে এখন আমাদের কারখানায় প্রায় শতাধিক নারী কাজ করছেন। আমাদের কারখানায় তৈরি হয় জামা, ওড়না, থ্রি পিসসহ নারীদের নানা ধরনের পোশাক। এগুলো বিভিন্ন শহরের মার্কেট থেকে অর্ডার আসে। সেখানে সাপ্লাই দেওয়া হয়।
কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিক আনিছা খাতুন বলেন, আগে কাজের জন্য রোদে পুড়তে হয়েছে, বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। কখনও কাজ পেয়েছি, কখনও পাইনি। এখন নিজের এলাকার এই কারখানায় কাজ করে আমার সংসার অনেক ভালো চলছে।
নারীশ্রমিক রিয়া আক্তার বলেন, আগে আমরা ঘরেই বসে থাকতাম। এখন আমরা এই কারখানার কাপড়ে বুটিকের কাজ করে দেই, চুমকি লাগাই। এই কাজে আমাদের কারখানাতেও আসতে হয় না। নিজের ঘরে বসে কাজ করি। কাপড়ে বুটিক লাগানো হলে এসে জমা দিয়ে যাই। নিজ এলাকায় থেকে ঘরে বসে আয় করার একটি ভাল মাধ্যম পেয়েছি।
ভেলাবাড়ী ইউপি সদস্য আব্দুল করিম জানান, আমাদের অবহেলিত অঞ্চলে এরকম ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা চালু হয়েছে যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। এই কারখানায় কাজ করে অনেক বেকার নারীরা তাদের পরিবারে অর্থ যোগান দিতে পারবে। আমরা চাই সরকার এই সকল ক্ষুদ্র কারখানায় নজর দিয়ে বৃহৎ পরিসরে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা গড়ে তুলে বেকার নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। এই ধরনের কারখানার উদ্যোক্তাগণ আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।