বিনোদন জগতের সংগীতাঙ্গনের বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি গিটারবাদক, সুরকার ও সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন আজ। যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, তবে আজ ৬৪ বছরে পা দিতেন এ গিটারবাদক। ১৯৬২ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
এ কিংবদন্তির সংগীতশিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে এবার প্রকাশ পাচ্ছে তার ২০টি কালজয়ী গান। নতুন সংগীতায়োজনে গানগুলো নিয়ে সাজানো হয়েছে বিশেষ অ্যালবাম ‘উত্তরাধিকার’। আজ রোববার (১৬ আগস্ট) তার জন্মদিনে অ্যালবামটি প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে দেশের আটটি উদীয়মান ব্যান্ড ও ১২ জন একক শিল্পী কণ্ঠ দিয়েছেন।
দ্বৈত অ্যালবামের পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমেও গানগুলো প্রকাশ করা হবে। ইকবাল আসিফ জুয়েলের তত্ত্বাবধানে তৈরি অ্যালবামটিতে থাকছে আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘নীল বেদনা’, ‘গতকাল রাতে’, ‘চাঁদ মামা’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মাধবী’ ও ‘বাংলাদেশ’সহ আরও বেশ কয়েকটি গান।
মাত্র ৫৬ বছরের জীবনে আইয়ুব বাচ্চু বাংলা সংগীতকে যা দিয়ে গেছেন, তা তাকে করে তুলেছে অনন্য। গিটার হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার পরিবেশনা যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করত, ঠিক তেমনি তার কণ্ঠের গান ছুঁয়ে যেত শ্রোতাদের হৃদয়। ভক্ত-অনরাগীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘বস’। কারও কাছে ‘স্যার’। আবার কারও কাছে সংগীতাঙ্গনে পরিচিত ছিলেন গিটারের জাদুকর হিসেবে।
আইয়ুব বাচ্চু রকসংগীতের শিল্পী হলেও নিজেকে কোনো একটি ঘরানায় আটকে রাখেননি। আধুনিক গান, লোকগীতি ও চলচ্চিত্রের গানেও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন তিনি। তার কণ্ঠ, সুর ও গিটারের অনন্য মিশেলে তৈরি হয়েছে অসংখ্য জনপ্রিয় গান। ১৯৮৩ সালে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন এ গিটারবাদক।
এরপর প্রতিভা, পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সোলসসহ বিভিন্ন ব্যান্ডে কাজ করার পর ১৯৯০ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, যা পরবর্তী সময়ে ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’ বা এলআরবি নামে পরিচিতি পায়। তবে হাসি-আনন্দের আড়ালে আইয়ুব বাচ্চুর ভেতরে ছিল গভীর অভিমান ও বেদনা।
কাছের মানুষের ভাষ্যানুযায়ী, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও অভিমানী একজন মানুষ। নিজের কষ্ট সবসময় প্রকাশ করতেন না। কখনো কখনো সেই না বলা কথাগুলোই উঠে এসেছে তার গান ও সুরে। মায়ের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। মায়ের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা নানা সময় নিজেই বলেছেন। মায়ের চলে যাওয়া তার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হয়েছিল।
আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ছিল গিটার। তিনি বলতেন, গিটারই তার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। জীবনের বড় একটি অংশ তিনি গিটার সংগ্রহ ও বাজানোর পেছনে ব্যয় করেছেন। বিভিন্ন দেশে গিয়ে নামি গিটারের দোকানে ঘুরেছেন, নতুন গিটার সংগ্রহ করেছেন। তার কাছে এসব গিটার ছিল শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, আবেগ ও ভালোবাসার অংশ। জীবনের শেষ দিকে নিজের গিটারগুলো নিয়ে দেশব্যাপী একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের স্বপ্নও দেখেছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন— প্রতিভাবান গিটারবাদকরা তার প্রিয় গিটারগুলো বাজাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। আজ তার জন্মদিনে আবারও মনে পড়ে সেই শিল্পীকে, যিনি গিটার হাতে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গান শুনিয়েছেন। তার চলে যাওয়ার আক্ষেপ হয়তো কখনোই শেষ হবে না। তবে তার সৃষ্টি, গান ও গিটারের সুর তাকে বাঁচিয়ে রাখবে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে। আইয়ুব বাচ্চু নেই, কিন্তু তার গান আছে। আর সেই গানেই বারবার ফিরে আসবেন গিটারের এই জাদুকর।